লিংথামের  বন বাংলো – এক অন্য অভিজ্ঞতা

২০১৯ সালের দূর্গা পুজোয়ে বেড়ানোর বিবরণ

লিঙ্তাম , ছবি স্বত্ব: শ্রী সুমন কুমার দাস

জুলুক লুপস থেকে সৌন্দর্য্য স্নাত হয় আমরা যাত্রা শুরু করি লিংথামের পথে। লিংথাম দক্ষিণ সিকিমের একটা ছিমছাম ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। খরস্রোতা নদী (bakhuterkhola) তার সৌন্দর্য্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। উত্তর সিকিম থেকে দক্ষিণ সিকিমের প্রাকৃতিক দৃশ্যের তারতম্য উল্লেখযোগ্য। বরফে ঘেরা নাথাং ভ্যালি থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে আমরা এসে পৌছাই লিংথামে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা কমে গিয়ে তখন বেশ গরম আবহাওয়া। ঠিক গরম বলা চলে না; পাহাড়ি নদী, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আর জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় সবমিলিয়ে অতি মনোরম পরিবেশ।

আমাদের লিঙ্গথামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অল্প বৃষ্টি শুরু হয়েছে তখন। পিচের রাস্তা শেষ। এক ফালি সরু পাহাড়ি রাস্তা। এক ধারে পাহাড়, অন্য ধারে নদীর খাদ। দুজন সহকারি আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে আগে আগে আর আমরা আমাদের বাচ্চা আর ক্যামেরা নিয়ে পিছন পিছন এগিয়ে চললাম। এক মিনিটের রাস্তা প্রায় দশ মিনিট ধরে অতিক্রম করে এসে পড়লাম এক ভাসমান ব্রিজের উপর। তার অপর প্রান্তে রয়েছে সেই বনবাংলো (forest house) যাকে দেখার উন্মাদনা আমাদের বহুদিন ধরে অশান্ত করে রেখেছিল। এই নিঃশব্দ, প্রায় নির্জন জায়গায় পাহাড়ের গায়ে আঘাত পাওয়া নদীর স্রোতের গর্জনে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর আবহ তৈরি হয়েছে। ভাসমান সেতুতে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখাই কঠিন। নিচে চোখ পড়তে হাড় হিম হয়ে যায়। যদিও আমার ছেলে কোনরকম অবলম্বন ছাড়াই দৌড়াতে দৌড়াতে অপর পাশে গিয়ে আমাদের মনোবল বাড়ানোর প্রয়াস শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে।

পথ নির্দেশ

অপরপ্রান্তে রাস্তাটা বেশ ভালো। পাথর দিয়ে বাঁধানো সিঁড়ির মতো রাস্তা উপরে উঠে গেছে। কিছুটা যেতেই ডানদিকে আরেকটা রাস্তা চলে গেছে সেই বনবাংলোর দিকে। অবশেষে পৌঁছালাম। তখন বিকেল সাড়ে তিনটে। মধ্যাহ্নভোজন রাস্তাতেই সারা হয়ে গেছিল। তাই তারা ‘চা‘য়ের বন্দোবস্ত করতে গেলেন আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরের চাবি রেখে দিয়ে।

এবারে আসি বনবাংলোর বর্ণনায়। দুই দিকে বিশাল পাহাড়, আর দু দিক দিয়ে সেই নদীটা বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত ধারায়। বনবাংলোটার নিচের দিকে সিমেন্টের গাঁথুনি আর তার উপরে কাঠের তৈরি ঘর। প্রধান দরজার সামনে একটা ছোট্ট ছাউনি। বেশ কয়েকটা চেয়ার রাখা। তার সামনে পাথর বিছানো একফালি জমি। Bonfire এর বন্দোবস্ত আছে। কাঠের ছাউনি দিয়ে একটা চালা মত বানানো যেখানে বেশকিছু কাঠ সঞ্চয় করে রাখা আছে। তারপর পাহাড় আর গাছ। এই গেস্ট হাউসের এক পাশে রান্নাঘর। ইঁটের পাকা ঘর টিনের ছাউনি। রান্না ওখানে কখনো কখনো হয়। এই অতিথিশালার যিনি মালিক তাঁর আরেকটি গেস্টহাউস আছে গ্রামের মধ্যেই। সেখানেই রান্না হয়ে থাকে। রাতের খাবার ওখান থেকেই আসে।

যাইহোক প্রধান দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় দুই দিকে তিনটি করে ঘর আর মাঝে চলাচলের একফালি সরু রাস্তা। কার্পেট বিছানো। ঘরগুলি খুবই ছোট ছোট। একটি ঘর এই গেস্ট হাউজের জন্যই বরাদ্দ। বাকি পাঁচটা ঘর পর্যটকদের জন্য রয়েছে যদিও বা আমরা ছাড়া আর কোন পরিবার ওখানে ছিল না তখন। আমাদের ঘরটিতে দুটো বড় বড় বিছানা আর একটা টেবিল ছোট্ট। সাথে আধুনিক সাজে সজ্জিত একটা স্নানঘর। তবে ঘরে আসবাবপত্র ছাড়া চলার জায়গা একদমই নেই। যাই হোক, ঘরগুলো যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা সরু বারান্দা। বসার ব্যবস্থা রয়েছে।


সামনে কিছুটা জমিতে ধনেপাতা, লংকা, বাঁধাকপি, স্কোয়াশ ইত্যাদি কিছু শাকসব্জি করা হয়েছে। সিকিমের এই বৈশিষ্ট্য বেশ চোখে পড়ার মতো ই। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কিছু কিছু শাক-সব্জি চাষ হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। তার পরেই বড় বড় গাছ, পাহাড় ও নদী। চারপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে হাজির হলো চা আর টা। ততক্ষণে পরন্ত বিকেল| ২-৩ জন মিলে শুরু করে দিয়েছেন বনফায়ারের বন্দোবস্ত| সন্ধ্যে থেকে শুরু হলো বনফায়ার, নাচ, গান আর গল্প| 

দর্শনীয় স্থান

পরের দিন, ৮ই অক্টোবর, সুর্যোদয় দেখার পর প্রাতঃরাশ করে ওই ছোট্ট সুন্দর গ্রামটা প্রদক্ষিন করতে বেরিয়ে পড়লাম| প্রায় ৮০ বছরের পুরানো মিল, মনেস্ট্রি ঘোরার সাথে সাথে স্থানীয় লোকেদের সাথে কিছু আলাপচারিতাও হয়ে গেল| দুপুরের মেনুতে ছিল স্কোয়াশের মোমো আর স্যুপ| কিন্তু স্বাদ চাখতে গিয়ে আশাহত হলাম| চারপাশের সৌন্দয্যের আস্বাদন নিতে নিতে সন্ধে গড়িয়ে রাত |  তবে বনের কীট পতঙ্গের হাত থেকে সাবধানতা বজায় রাখাই শ্রেয়| তারা যখন তখন ঘরেও হানা দিতে পারে| 

৯ই অক্টোবর, সকালে তুরুকের উদ্দেশ্যে  গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম| তুরুকের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখা নিয়ে ফিরে এসব পরের পোস্টে|

পরবর্তী পর্ব: তুরুক

বিঃ দ্রঃ – সিকিমের অনেক জায়গায় ভ্রমণের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়। তাই, রেজিস্টার্ড ট্রাভেল এজেন্সি বা গভমেন্ট ওয়েবসাইট থেকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে তবেই ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেবেন। ভারতীয় এবং অভারতীয়দের জন্য আলাদা অনুমতির ব্যবস্থা আছে।

( উপরোক্ত বিবরণ টি লেখিকার সম্পূর্ণ নিজস্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। বিভিন্ন তথ্যের উৎস স্থল হল স্থানীয় বাসিন্দা, গাড়ির ড্রাইভার ও ট্রাভেল এজেন্টের সাথে কথোপকথন। )

Disclosure: This page may contain affiliate links which means if you make any purchase by using the links, I’ll get some commissions.

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Design a site like this with WordPress.com
Get started