২০১৯ সালের দূর্গা পুজোয়ে বেড়ানোর বিবরণ

তুরুক ছোট্ট একটা পাহাড়ি গ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর। খুব কম জনবসতিপূর্ণ এই গ্রামে গেস্ট হাউসই একমাত্র সম্বল। তুরুক কুঠীতে আমাদের বুকিং ছিল আগে থেকেই। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল। বিশাল এলাকা নিয়ে এই কুঠি। এখানকার উষ্ণ অভ্যর্থনা মনে রাখার মত। সুন্দরভাবে সাজানো আধুনিক আসবাবে সজ্জিত প্রত্যেকটি কটেজ। শিউলি, জবা, ডুমুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন অর্কিডের বাহার প্রতিটি ঘরের সামনে। পোষ্য হিসেবে কুকুর থেকে শুরু করে মুরগী পর্যন্ত সবই রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি জিনিসই অত্যন্ত পরিষ্কার ও নিয়মিত সংরক্ষিত। কুঠিগুলো শেষ হতেই শুরু হয়েছে ওনাদের অর্গানিক ফার্ম। দারুণ অভিজ্ঞতা। শেষ প্রান্তে পাথর কাটা সিঁড়ি নেমে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখি একটা সরু নদী বয়ে চলেছে। নিস্তব্ধ চারিপাশ। নদীর স্রোতের নিরন্তর আওয়াজ যেন সুরমূর্ছনা তৈরি করেছে। সন্ধ্যায় কটেজের সামনের বারান্দায় বসে থাকলে কিভাবে যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি হয়ে যাবে তা বোঝাই দুষ্কর। উল্টোদিকের পাহাড়ের কোলে কালিম্পং শহর। গেস্ট হাউজের বারান্দা থেকে ছোট ছোট আলোয় ভরা কালিম্পং শহর বেশ মায়াবী।

খাবারের কথা না জানালে এখানকার আসল আকর্ষণ সম্পর্কে আপনারা অবহিত হতে পারবেন না। ডাইনিং রুমের মাঝখানে টেবিল চেয়ার। চারপাশে ফোকাস আলোর বন্দোবস্ত। জানা গেল ছোটখাটো পার্টি অনুষ্ঠানের জন্য বন্দোবস্ত করা আছে।
পথে ওনারা আমাদের খাবারের আমিষ নিরামিষ, পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুই জেনে নিয়েছিলেন। সারাদিন রাস্তায় গাড়ির ধকল যাবার জন্য রাতের মেনু হালকা ছিল। মেনুতে ছিলো ডাল, ভাত, মাছের ঝোল আর স্কোয়াশ মটর। অপূর্ব স্বাদ। অপূর্ব ব্যবহার। রাঁধুনীদাদার ২৫ – ৩০ বছরের রান্নার অভিজ্ঞতাই শুধুই নয়, রান্নার প্রতি তার ভালোবাসাও প্রকাশ্য। ওনার সাথে কথা বলতে বলতে নৈশভোজ সমাপ্ত হয়। এর স্বাদ চিরকাল মনে রাখার মত| রাধুনী দাদাকে অশেষ ধন্যবাদ| উনি যে শুধু নিজের হাতে রান্না করেছেন তা নয় এই সুবিশাল হেরিটেজ হাউজের সংরক্ষণের দায়িত্বও পালন করেন|
পরেরদিন আবার সুস্বাদু বিভিন্ন পদ যোগে প্রাতঃরাশ ও মধ্যাহ্নভোজনের পর আমরা বেরোলাম তারে বীর দর্শনে।

পাহাড়ের মাঝখানে দিয়ে সিঁড়ি ও রাস্তা বানানো। দুদিকে রেলিং দেওয়া। দুদিকেই খাদ নেমে গেছে। রাস্তা ধরে যতই এগোনো যাবে ততই যেন পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির কাছে পৌঁছানো যায়। রঙ্গিত ও তিস্তা নদীর মেলবন্ধনের সাক্ষী হতে পারবেন| এক নৈসর্গিক দৃশ্যের সম্মুখীন| সব সৌন্দর্য্য হয়তো ক্যামেরার লেন্সে বন্দি থাকে না, তবুও কিছু ছবি তুলে আর সূর্যাস্ত দেখে রওনা হলাম|
সেদিন রাতে চিকেন মোমো, স্যুপ আর কারমেল পুডিং সহযোগে ডিনার শেষ হলো| রাতে বেশ ঠান্ডা| এবছরের সিকিম ভ্রমনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা তুরুক| কর্ম ব্যস্ততা থেকে ২-৩ দিন বিরতি নেবার জায়গা হিসাবে আদর্শ|

খুব সুন্দর অভিজ্ঞতাকে স্মৃতি করে আমরা পরের দিন দুপুরে বিদায় নিলাম তুরুক থেকে | পথ চলা শুরু কালিম্পং এর উদ্দেশ্যে|
পরবর্তী পর্ব: কালিম্পং
বিঃ দ্রঃ – সিকিমের অনেক জায়গায় ভ্রমণের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়। তাই, রেজিস্টার্ড ট্রাভেল এজেন্সি বা গভমেন্ট ওয়েবসাইট থেকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে তবেই ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেবেন। ভারতীয় এবং অভারতীয়দের জন্য আলাদা অনুমতির ব্যবস্থা আছে।
( উপরোক্ত বিবরণ টি লেখিকার সম্পূর্ণ নিজস্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। বিভিন্ন তথ্যের উৎস স্থল হল স্থানীয় বাসিন্দা, গাড়ির ড্রাইভার ও ট্রাভেল এজেন্টের সাথে কথোপকথন। )